ইরান গণ-অভ্যুত্থান ২০২৫-২০২৬
২০২৫ সালের শেষভাগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ইরানের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২৫ সালের মধ্যভাগে ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বিপ্লবের রূপ নিয়েছে।
১. ঘটনার পরিক্রমা (Timeline)
- সূত্রপাত (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫): তেহরানের বিখ্যাত আলাউদ্দিন শপিং সেন্টার এবং গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে দোকান বন্ধ করে প্রথম ধর্মঘট শুরু করেন (Reuters, Associated Press)।
- দেশব্যাপী বিস্তার: ২৯ ডিসেম্বর থেকে ইসফাহান, শিরাজ ও মাশহাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৮ জানুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির আহ্বানে বড় ধরনের সমাবেশ ঘটে এবং সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দেয় (NetBlocks, Reuters)।
- বিক্ষোভের তীব্রতা (৯ জানুয়ারি): ইসফাহানে সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। আয়াতুল্লাহ খামেনেই এই বিক্ষোভের জন্য সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করে হুঁশিয়ারি দেন (Al Jazeera, Indian Express)।
২. গভীর কারণসমূহ: অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে তিনটি প্রধান কারণে (The National, Economic Times):
- মুদ্রার রেকর্ড পতন: ইরানি রিয়ালের মান ১ ডলারে ১.৪৬ মিলিয়ন টোমানে নেমে এসেছে। বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৪৮% ছাড়িয়েছে এবং খাদ্যমূল্য প্রায় ৭২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
- যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি: ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ ধ্বংস হওয়া ছিল অন্যতম অনুঘটক।
- সরকারের প্রতি অনাস্থা: দুর্নীতি, বিদেশে (হিজবুল্লাহ-হামাস) বিপুল অর্থ সহায়তা এবং ২০২৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের অর্থনৈতিক সংস্কারে ব্যর্থতা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।
৩. স্লোগান ও প্রতীকী আন্দোলন
বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবির সপক্ষে সরাসরি এবং কঠোর স্লোগান ব্যবহার করছেন (Sky News, CNN):
"মার্গ বার ডিক্টেটর" (একনায়কের মৃত্যু হোক), "না গাজা না লেবানন, জানাম ফাদায়ে ইরান" (গাজা বা লেবাননের জন্য নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য), এবং "পাহলভি ফিরে আসবে"।
সিংহাসন ও সূর্যের (Lion and Sun) পতাকা ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকেই ১৯৭৯ পূর্ববর্তী রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করছেন। এই আন্দোলনে জেন-জি (Gen-Z) ছাত্র সমাজের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
৪. সহিংসতা ও মানবিক পরিস্থিতি
- হতাহতের সংখ্যা: হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA)-এর তথ্যমতে, ৩১ ডিসেম্বর থেকে অন্তত ৪২ জন প্রতিবাদকারী নিহত এবং ২,২৭০ জনেরও বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন (Guardian, HRANA)।
- দমন কৌশল: সরকার বিক্ষোভ দমাতে ইরাকি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করছে এবং ইলম প্রদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আহত বিক্ষোভকারীদের ধরতে অভিযান চালিয়েছে (CNN, The Guardian)।
৫. আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন এবং কুর্দিশ দলগুলোর সক্রিয়তা এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। যদি বর্তমান অর্থনৈতিক পতন চলতে থাকে, তবে ইরানে রাজতন্ত্রের পুনরুদ্ধার বা একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা (Atlantic Council, BBC)।
তথ্যসূত্র:
- Reuters: "Khamenei warns protesters as rial collapses", Jan 2026.- Al Jazeera: "Iran's economic crisis triggers nationwide unrest", 2026.
- The Guardian: "Security forces raid hospitals as Iran protests grow", Jan 6, 2026.
- Economic Times: "1.4 million rials to a dollar: What's fueling Iran anger", 2026.
- Wikipedia: "২০২৫–২০২৬ ইরানি বিক্ষোভ" (bn.wikipedia.org).